রঞ্জনা বিশ্বাস:
২১ আগস্ট ২০০৪। ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত এবং শত শত মানুষ আহত হন। ‘তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিলেন’—প্রাথমিক তদন্তে এমন অভিযোগ ও তথ্য সামনে এসেছিল।

রাজনৈতিক-সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাটিকে রাজনৈতিক সহিংসতা হিসেবে দেখা যায়। রাজনৈতিক সহিংসতা বলতে সাধারণত এমন সহিংসতাকে বোঝায়, যার উদ্দেশ্য শুধু ব্যক্তির ক্ষতি সাধন নয়। এর প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার ভেতর দিয়ে ক্ষমতা নিশ্চিত করা।

এই অর্থে ২১ আগস্টের হামলাকে শুধু হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। এর লক্ষ্য ছিল একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বকে ধ্বংস করা এবং নেতৃত্বের রাজনৈতিক সক্ষমতাকে বিপর্যস্ত করা।

এই তাত্ত্বিক কাঠামোর ভেতর দিয়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের কোটা সংস্কার আন্দোলনের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়।

একটি আন্দোলনের ঘোষিত দাবি পূরণ হলে স্বাভাবিকভাবেই আন্দোলনের তীব্রতা কমে আসার কথা। কিন্তু জুলাইয়ের আন্দোলন পরবর্তী পর্যায়ে কেবল কোটা সংস্কারের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা সরকার পতনের দাবিতে রূপান্তরিত হয় এবং সরকার পতনের পরও রাজনৈতিক সহিংসতা অব্যাহত থাকার ঘটনা সামনে আসে।

কাজেই সমাজতাত্ত্বিকভাবে যে প্রশ্নটি তৈরি হয় তা হলো—আন্দোলনের ঘোষিত দাবি এবং আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিণতি কি একই ছিল?

যদি কোনো আন্দোলন তার প্রাথমিক দাবি অতিক্রম করে একটি রাজনৈতিক শক্তি ও তার নেতৃত্বকে সম্পূর্ণভাবে ক্ষমতাচ্যুত বা রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করার লক্ষ্যে অগ্রসর হয়, তাহলে সেটিকে কি নীতিগত প্রতিবাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়? গণতন্ত্রীরা কী বলেন? তখন তো সেটাকে রাজনৈতিক সহিংসতা এবং রাজনৈতিক অভিঘাতের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা উচিত। এবং এর নিরিখেই বিচার করা উচিত।

৫ আগস্ট সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা, হত্যা, নির্যাতন, গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক কার্যালয় ও স্থাপনা ভাঙচুরসহ বিভিন্ন ঘটনার অভিযোগ এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। তবে এসব ঘটনার প্রত্যেকটির ক্ষেত্রে পৃথকভাবে প্রমাণ, দায় ও প্রেক্ষাপট যাচাই করা জরুরি।

২১ আগস্ট এবং ২০২৪-এর ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে তুলনামূলক তাত্ত্বিক প্রশ্ন উঠে আসে:

রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার পরিবর্তে যখন তাকে নিশ্চিহ্ন বা রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস করার প্রবণতা তৈরি হয়, তখন গণতান্ত্রিক রাজনীতি কি ধীরে ধীরে পলিটিক্যাল এলিমিনেশনের দিকে চলে যায় না? যদি যায়, তাহলে এই ঘটনাগুলোর এলিমিনেটর কারা?

এই এলিমিনেটররাই প্রতিপক্ষকে অস্বীকার করার একটি পদ্ধতি হিসেবে সহিংসতাকে বৈধতা দেয়। শুরু হয় মব জাস্টিসের মতো ঘটনা।

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা যেমন রাজনৈতিক সহিংসতার চরম উদাহরণ, তেমনি ২০২৪-এর পর কোনো রাজনৈতিক দল বা তার নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হত্যা, নির্যাতন কিংবা রাজনৈতিক নিপীড়নও একই নৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিক মানদণ্ডে বিচার করা উচিত।

কারণ সহিংসতার কোনো দলীয় পরিচয় নেই।

গণতন্ত্রের মূলনীতি হলো যুক্তির মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা, ধ্বংস করা নয়। মতের বিপরীতে মত, সংগঠনের বিপরীতে সংগঠন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা, নির্যাতন, ভয় দেখানো কিংবা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা গণতন্ত্রের নীতিকে অস্বীকার করে।

২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলা, ২০২৪-এর জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক সহিংসতা শুধু গণতন্ত্রবিরোধী নয়, এটি মানবিকতাবিরোধীও। কারণ একটি গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হত্যাযোগ্য শত্রু হতে পারে না, সে ভিন্নমত পোষণকারী নাগরিক।
লেখক: রঞ্জনা বিশ্বাস